বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন
খায়রুল আলম রফিক : যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তদন্তে সম্প্রতি ১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্পে ২৯২ কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে উপ-পরিচালক ফারজানা পারভীনসহ ৭ জনের নামে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখা।যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি এ বছরের শুরুর দিকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও সিলেটের জকিগঞ্জের স্থানীয় অ্যাকাউন্টস অফিসের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলামসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্রের এমন প্রমাণ পাওয়া যায় । তিনি একই মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন থাকায় দুর্নীতি অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলাম। ডেপুটি সেক্রেটারি ফজলে এলাহীর নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটির তদন্তে জানা গেছে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আলী আশরাফ ২০২০-২০২১ এবং ২০২১-২০২২ অর্থবছরে জকিগঞ্জে যুবকদের জন্য একটি দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দ করেছিলেন, যদিও ওই প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের নভেম্বরেই শেষ হয়ে যায়। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে জমা দেওয়া ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা ওই অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাৎ করেছেন। অর্থ আত্মসাতে জড়িতরা হলেন—উপপরিচালক আলী আশরাফ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারহাত নূর, সহকারী পরিচালক ফজলুল হক, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আজহারুল কবির ও আবুল কালাম আজাদ, হিসাবরক্ষক নুরুল আমিন, অফিস সহকারী বাবুল পাটোয়ারী ও জসিম উদ্দিন, অ্যাকাউন্টস অফিসার কামাল হোসেন ও অডিটর ইকবাল মুন্সি ও ডা: জহিরুল ইসলামসহ আরো কয়েক কর্মকর্তা। এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কমিটি জানায়, ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ওই প্রকল্প থেকে ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

দুর্নীতি করেও পুরস্কৃত:
গত বছর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৫টি পৃথক তদন্তে জানা গেছে যে, ৫ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা যুবকদের ঋণ দেওয়ার নামে ২৬ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন এবং ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপ- পরিচালক ফারজানা পারভীনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ২৯২ কোটি টাকা দুর্নীতি – অনিয়ম অভিযোগ এনে ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা হয়। মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ শাখার উপ-পরিচালককে অনুসন্ধান ও তদন্ত করার নির্দেশ দেন আদালত। পরে ৬ জনের নামে অনুসন্ধান করেন দুদক । দুর্নীতি তদন্তকালে উপ-পরিচালক ফারজানা পারভীনকে দুর্নীতির শাস্তি না দিয়ে ভাল স্থানে পদায়ন করেছেন মন্ত্রণালয়। ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৯২ কোটি টাকা দুর্নীতির পেছনে যিনি নাটের গুরু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলাম। তদন্তে দেখা গেছে, সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আনোয়ারুল কবির ১৭ লাখ ৪ হাজার টাকা, গোলাম ফারুক ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, আইনুল ইসলাম ভূঁইয়া ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, দীপক কুমার মণ্ডল ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং রফিকুল ইসলাম শেখ ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেনবিভাগীয় ব্যবস্থা চলাকালেও তারা সবাই স্বীকার করেন যে তারা আর্থিক অপরাধে জড়িত। কিন্তু নথি থেকে জানা গেছে, অপরাধের সাজা হিসেবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর শুধু তাদের বেতন কমিয়েছে ও পেনশন সুবিধা থেকে আত্মসাৎ করা টাকা উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে, আনোয়ারুল ছাড়া অভিযুক্তদের সবাই ২০২১ সালের নভেম্বরে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একাধিক বিভাগীয় তদন্তে তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হলেও তাদের কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন। এজন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে মোটা অঙ্কের টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ১১৭৫ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার তালিকা থেকে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের জন্য ৭০ জন কর্মকর্তাদের বাছাই করেছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমান। তার বাছাই করা কর্মকর্তাদের মধ্যে ৪ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত এবং ৭০ জনই সুপারিশ করা কর্মকর্তাদের তালিকার সবচেয়ে নিচে ছিলেন, অর্থাৎ সবচেয়ে কম যোগ্য ছিলেন। তদন্ত কমিটি ওই ৭০ জন কর্মকর্তাদের মধ্যে ১ জনের স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক লেনদেনের সন্ধান পেয়েছে এবং এমন মেসেজের স্ক্রিনশট খুঁজে পেয়েছে যেখানে একজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা তার সহকর্মীকে অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলছেন। ঢাকার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ২৫ জুলাই এক রায়ে ৭০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশকে ‘বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন বৈঠকেও ওই আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এখনও আদেশ বাতিল করেনি। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বেশ কয়েকজন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতিগ্রস্তদের যদি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরিচ্যুত না করা হয় তবে এই ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। অভিযোগের বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক মোখলেছুর রহমান তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, তিনি শুধু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এবং মহাপরিচালকের নির্দেশ পালন করেছেন। জানাগেছে, মোঃ ফরহাত নূর, উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মাগুরা (পূর্ববর্তী কর্মস্থলঃ উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ), মহাপরিচালকের, কার্যালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ঢাকা) এর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৪(৩) বিধি অনুযায়ী, চাকুরী হইতে বরখাস্তকরণ’ গুরুদন্ড আরোপের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয়ের পরামর্শ প্রদান। স্মারক নম্বর- ৮০,০০,০০০০.১১৫.৩৪.০১০,২৪-৫৫, সূত্র: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুব-০১ শাখার স্মারক নম্বর ৩৪.০০.০০০০.০৫১.০৪.০০৭, (ডিপি নং-৩).২৩.১০৩৩, তারিখ:২৮.০১.২০২৪।
উপর্যুক্ত বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক সূত্রোক্ত স্মারকের মাধ্যমে জনাব মোঃ ফরহাত নূর, উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মাগুরা (পূর্ববর্তী কর্মস্থলঃ উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ), মহাপরিচালকের কার্যালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ঢাকা) এর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর দায়ে একই বিধিমালার ৪(৩) (ঘ) বিধি অনুযায়ী “চাকুরী হইতে বরখাস্তকরণ” গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। ০২. উক্ত প্রস্তাব কমিশনে উপস্থাপন করা হলে প্রাপ্ত কাগজপত্র পরীক্ষান্তে মোঃ ফরহাত নূর, উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মাগুরা (পূর্ববর্তী কর্মস্থলঃ উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ), মহাপরিচালকের কার্যালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ঢাকা) এর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর দায়ে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় একই বিধিমালার ৪(৩) (ঘ) বিধি অনুযায়ী “চাকুরী হইতে বরখাস্তকরণ” গুরুদন্ড আরোপ করা যায় মর্মে কমিশন পরামর্শ প্রদান করেছে।